বাংগালী তরুন বিজ্ঞানবিদ।

বিশ্বখ্যাত কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) জার্নাল টেকনোলজি রিভিউ ঘোষিত ২০১৬ সালে ৩৫ বছরের কম বয়সী সেরা ৩৫ জন উদ্ভাবকের সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন বাঙালি তরুণ এহসান হক। এর আগে এই সম্মাননা যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে আছেন গুগলের দুই প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন ও ল্যারি পেজ, ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ, আইম্যাক ও আইপ্যাডের ডিজাইনার জোনাথন আইভ, লিনাক্সের জনক লিনাস টরভাস, ইয়াহুর সহপ্রতিষ্ঠাতা জেরি ইয়াং, টুইটারের জ্যাক ডরসে প্রমুখ। বলা যায় এমআইটির এই তালিকার অনেকেই পরবর্তী সময়ে বিশ্বকে বদলে দেওয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।

বাঙালি এহসান হকের কাজ হলো মানুষের কথা ও শারীরিক ভাষার গাণিতিক মডেল বের করে সেটাকে কাজে লাগানো। এর মাধ্যমে তৈরি হবে এমন যন্ত্র, যা অটিজম বা ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্তদের আলাপচারিতায়, চাকরিপ্রার্থীদের সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতিতে, এমনকি বিতার্কিক বা বক্তাদের তাঁদের বক্তৃতার ভুলগুলো সংশোধন করতে সহায়তা করবে। এরই মধ্যে বানানো হয়েছে একটি বিশেষ চশমা, যা বক্তৃতা দেওয়ার সময় বক্তাকে আরও সাবলীল হতে সাহায্য করে।
মানুষে মানুষে কথোপকথন বা আলাপচারিতা অনেকটা দ্বৈত নাচের মতো। আমরা একে অন্যের কথাবার্তা, আকার-ইঙ্গিত, ভাবভঙ্গি বুঝে কথার পিঠে কথা বলে আলাপচারিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাই। যদিও আলাপচারিতার এই ‘মুদ্রা’ বা কৌশল কোথাও লেখা নেই, কেউ জানে না, কিন্তু সবাই (মানুষ) বোঝে।
আর এহসানের কাজ হলো আলাপচারিতার এই কৌশলগুলোকে কম্পিউটারের কাছে বোধগম্য করে তোলা। তাতে লাভ?
‘লাভ তো অনেক কিছু।’ টেলিফোনে প্রথম আলোকে এহসান বলেন, ‘যেমন ধরুন যাদের অটিজম বা এসপারগার সিনড্রম আছে, তাদের অনেকেই মানুষের সঙ্গে সহজভাবে কথা বলতে পারে না, বুঝতে পারে না অন্যের আবেগ | কথা বলা শুরু করলে কখন থামবে বুঝতে পারে না, তাদের কথায় অন্য কেউ বিরক্ত হচ্ছে নাকি আনন্দিত হচ্ছে, সেটাও বুঝতে পারে না। কারণ আলাপচারিতার শারীরিক ভাষাটা তাদের কাছে বোধগম্য নয়। এখন যদি এমন হতো যে সেই মানুষটির সঙ্গে আছে এমন যন্ত্র, যা বলে দেবে শ্রোতার মনোভাব। মানে শ্রোতার হাসি আসলেই আনন্দের না কাষ্ঠ হাসি। তাহলে এ ধরনের মানুষের যোগাযোগ সক্ষমতা অনেক বেড়ে যেত।’
এহসানের বানানো মাক (MACH-My Automated Conversation coacH) ও লিসা (LISSA-Live Interactive Social Skills Assistant) প্রোগ্রাম তাৎক্ষণিকভাবে বলে দিতে পারে একজন মানুষ কথার মধ্যে কতবার ‘এ্যা, আহহহ’ ইত্যাদি বলেছে। কথা বলার সময় তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি স্বাভাবিক না আরোপিত। তার শব্দ প্রক্ষেপণ কী যথাযথ?

এমআইটি মিডিয়া ল্যাবে কাজ করার সময় এহসান প্রথমে বানান মাক, যা এমআইটির শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকারে দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। পরে সেটিকে বিকশিত করে ভিন্নভাবে সক্ষম কিংবা অটিস্টিক ব্যক্তিদের সহায়তা করার জন্য তৈরি করেছেন লিসা।
মানুষের মুখাবয়ব পর্যালোচনা করে মানুষের অভিব্যক্তি নির্ণয় করার কাজটি কেমন করে হয়, সেটি ব্যাখ্যা করে এহসান বললেন, ‘মূল কথাটি সোজা, উদাহরণের মাধ্যমে শিক্ষা। যেমন মানুষের মুখটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বলের মতো গোলাকার। কিন্তু তারপরও একটা অস্পষ্ট ছবিতে একজন মানুষের মুখ আর ফুটবল পাশাপাশি রাখলে আমরা খুব সহজেই বলে দিতে পারি কোনটা ফুটবল এবং কোনটা মানুষের মুখ। মানুষের পক্ষে এই কাজটা খুব সহজেই করে ফেলা সম্ভব, কারণ আমরা ছোটবেলা থেকে মানুষের মুখ দেখে অভ্যস্ত। ঠিক তেমনিভাবে মেশিনকে অনেকগুলো মানুষের মুখের ছবি উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হলে আধুনিক গাণিতিক পরিভাষা ব্যবহার করে মেশিনের পক্ষেও মানুষের চেহারা শনাক্ত করা সম্ভব। তবে কাজটি মোটেই সোজা নয়।’
সহজ নয় বলেই তো কাজটি করার জন্য এমআইটির টিআর৩৫-এ নির্বাচিত হয়েছেন এহসান হক। ব্যবসায়ী বাবা এনামুল হক ও মা প্রয়াত সৈয়দা লুৎফে সাবার তিন সন্তানের একজন এহসান হক! পড়াশোনা ঢাকার উদয়ন স্কুল এবং পরে ঢাকা কলেজে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। ইউনিভার্সিটি অব মেমফিস থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর | ২০০৮ সাল থেকে এমআইটির বিখ্যাত মিডিয়া ল্যাবে কাজ করেন—মানুষের মুখাবয়ব ও কণ্ঠ বিশ্লেষণ করে যন্ত্রকে মানুষের আবেগ শনাক্ত করতে সাহায্য করা নিয়ে। ২০০৯ সালে ওয়াল্ট ডিজনির গবেষণাগারে প্রথম স্বয়ংক্রিয় রোবট—যা দেখতে, শুনতে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম—তৈরিতে সাহায্য করেছেন। ২০১০ সালে আইবিএম ওয়াটসন গবেষণাগারে তৈরি করেন বুদ্ধিমান বিজ্ঞাপন যন্ত্র, যা পথে চলতে থাকা মানুষের গতিবিধি, লিঙ্গ, বয়স, পরনের কাপড়ের রং ও ধরন বুঝে মানানসই বিজ্ঞাপন প্রচার করে! এরপর ২০১৩ সালে তৈরি করেন ‘মুড মিটার’, যা মানুষের চেহারা দেখে বলে দেয় রাগ না খুশি। ২০১৩ সালে এমআইটি থেকে পিএইচডি করার পর যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব রসেস্টারে। এখন সেখানে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন।
স্ত্রী নাফিসা আলম এবং দুই ছেলে ওয়ালি (৫) ও আরিককে (৫ মাস) নিয়ে এহসানের সংসার।
নিজের কাজের বিষয়ে এহসান বলেন, ‘যারা অন্যরকম তাদের আমরা সঠিকভাবে বুঝতে পারি না দেখে আমরা ওদের বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী বলে ডাকি। চেষ্টা করি ওদেরকে আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী “স্বাভাবিকে” পরিবর্তন করতে। আমার ধারণা পরিবর্তন দরকার আমাদের, আমাদের মনোভাবের। দরকার নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন প্রযুক্তির, যাতে বিশেষভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠী আমাদের সকলের মতো সম্মানজনক ও পরিণত জীবনের নিশ্চয়তা পায়।’