ডিজিটাল পোষাক ।















ফিউশনের পাশাপাশি এখন পোশাকের ফেব্রিকসে ডিজিটাল প্রিন্টের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন ডিজাইনাররা।

পাশ্চাত্য আর প্রাচ্যের ফ্যাশনের যোগসূত্রে ফিউশনধর্মী কাজ চলছে কয়েক বছর ধরে। পোশাকের কাট ও ডিজাইনে থাকছে এর প্রভাব। এখন কাটের পরিবর্তে ফেব্রিকের নকশাই গুরুত্ব পাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় পোশাকে এখন নানা ধরনের ডিজিটাল প্রিন্টের চল দেখা যাচ্ছে। কাটের বদলে পোশাকের ক্যানভাসে প্রিন্টের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন ডিজাইনাররা।
প্রিন্ট সব যুগে, ফ্যাশন তথা পোশাকশিল্পের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর রয়েছে নানা রূপ ও প্যাটার্ন। কোথাও জ্যামিতিক বৃত্ত, উপবৃত্ত, ত্রিভুজ, কোথাও বা ফুল, পাতাই হয়ে ওঠে প্রিন্ট পোশাকের মূল ডিজাইন।
 
পোশাক মানে কিছুটা শিল্প আর কিছুটা ডিটেইলিং। ফ্যাশনপ্রেমীরাও চান গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু পরতে। ফলে ডিজিটাল প্রিন্ট নিয়ে এখন বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে।’ আইকনিক ফ্যাশন গ্যারেজের উদ্যোক্তা ও ডিজাইন কনসাল্ট্যান্ট তাসলিমা মলি জানান, ‘তরুণ প্রজন্মের ঝোঁক এখন ফিউশনধাঁচের ফ্যাশনের দিকে। এ কারণেই ডিজিটাল প্রিন্টের পোশাক এখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে আমদানি করা কাপড়গুলোতে অ্যাজটেক সংস্কৃতির বিভিন্ন মোটিফ ব্যবহার করা হচ্ছে ডিজিটাল প্রিন্টের আদলে।’ ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, অ্যাজটেকদের আদি ভূমি ছিল মেক্সিকোতে। মেক্সিকান এই উপজাতির রঙিন ও আনন্দময় সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত এই প্রিন্ট। জেন্টল পার্কের চিফ ডিজাইনার শাহাদাৎ হোসেন বাবু বলেন, ‘প্রিন্টটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সাহসী সব রঙের সমন্বয়, গাঢ় কালো আউটলাইন আর জ্যামিতিক ফর্মের দৃঢ়তা। যেকোনো ধরনের পোশাকে চমৎকারভাবে এই শিল্পকর্মকে ফুটিয়ে তোলা যায়।
 পোশাকেও ডিজিটাল!
তাই ডিজাইনাররা ফ্যাশনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রত্ন-আবেদনময় মেক্সিকান প্যাটার্ন বেছে নিচ্ছেন।’ তাসলিমা মলি আরো জানালেন, ‘টি-শার্ট থেকে শুরু করে জাম্প স্যুট—সব কিছুতেই অ্যাজটেকের জ্যামিতিক প্রিন্টের আয়োজন নজর কাড়বে। আর সরাসরি ছবির প্রতিচিত্রের পাশাপাশি বিমূর্ত, ফ্লোরাল বা জ্যামিতিক মোটিফ সব সময়ই সাজ পোশাকে একটা অন্য রকম মাত্রা যোগ করে।’ রুম্মাইলা সিদ্দিকী জানান, ‘অনেক রঙের সমন্বয়ে কাপড়ে ডিজাইন করতে কম্পিউটারের মাধ্যমে সরাসরি প্রিন্ট ব্যবহার করা হয়। এভাবে নিশ্চিন্তে খুব সাশ্রয়ে কাপড়ে রং করা যায়। এ ছাড়া স্টিল সিলিন্ডারের ওপরের ইলেকট্রোপ্লেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে কপারের স্তর তৈরির পর লেজার দিয়েও ডিজাইন করা হয় কাপড়ে। এ ধরনের সিলিন্ডার প্রিন্টও করা হচ্ছে আমাদের দেশে।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘গতানুগতিক গ্রাফিকস আর্টের পাশাপাশি লাল, নীল, হলুদ, আকাশি, বেগুনি, গোলাপি কিংবা মেরুনের মতো বর্ণিল রং, গ্রীষ্মের ফুল, পাতা ও প্রজাপতি প্রিন্ট, গ্রাফিকস আর্টস, অ্যাজটেক প্রিন্ট চলতি ফ্যাশন ট্রেন্ড।’ পোশাকের ধরন কুর্তি, টপস, শর্ট কামিজ, লং কামিজ, জ্যাম্পস্যুট, স্কার্ট, জেগিংস বা স্টাইলিশ স্কিনি বটম কিংবা হালের ক্রেপটপেও এখন বর্ণিল ডিজিটাল প্রিন্ট জনপ্রিয়।


‘ডিজিটাল প্রিন্টের মধ্যে ফুলেল মোটিফের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।’ আমবার লাইফস্টাইলের ডিজাইনার শাহরিয়ার শাকিল জানান, ‘পোশাকে ফ্লোরাল প্রিন্ট সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। যেমন—ছোট আকারে বিভিন্ন রঙের ফুলের ছাপে পুরো ফ্যাব্রিকটি প্রিন্ট করা হয়। অন্যটি হলো, তুলনামূলকভাবে বেশ বড় আকারের বিভিন্ন রঙের ফুলের ছাপ। ফ্যাব্রিকের মধ্যে কটন, লিলেন, সিল্ক, জর্জেট, ক্যাশমিলনে ডিজিটাল প্রিন্ট বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।’ বাজার ঘুরে দেখা গেল, ফুলে ফুলে পুরো জমিন ছেয়ে যাওয়া পোশাক যেমন আছে, তেমনি এক রঙা কামিজ বা টপসের বুকের বাঁ পাশে কিংবা মাঝখানে একটা বা দুটো ফুলের প্রিন্ট দেওয়া পোশাকও আছে। কিছু কামিজের জমিনটা নীল বা গোলাপি। গলা থেকে বুকের মাঝবরাবর এবং হাতায় ভিন্ন রঙের প্রিন্টের কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু কামিজে দুই পাশের কাঁধ থেকে বুকের একটু নিচ পর্যন্ত ভিন্ন রঙের পরপর দুটি বা তিনটি কাপড়জুড়ে দিয়ে ইউশেপ আকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিছু টপস ও কামিজ দেখা গেল, যেগুলোর সামনের অংশে দুই পাশের কাঁধ থেকে নিচে পর্যন্ত চিকন ফুলেল প্রিন্ট করা। দেখতে অনেকটা মালার মতো। কিছু ফুলস্লিভ শার্টের বডিতে কালো, নীল, মেরুন বা অন্য কোনো রং আর বুকের একেবারে মাঝবরাবর একটা সাদা গোলাপের প্রিন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। ফ্লোরাল মোটিফের পাশাপাশি আছে জিগজ্যাগ প্যাটার্ন। ছোট ছোট কোণবিশিষ্ট এবং নিয়মিত বিরতিতে বাঁক নেওয়া এই প্যাটার্নকে অনেকে শেভরন প্যাটার্নও বলেন। স্ট্রাইপ আর ট্রাইবাল প্রিন্টের মাঝামাঝি যে প্রিন্ট, তাই জিগজ্যাগ। প্রথমদিকে দুই রঙা—কেবল সাদা আর কালোর কম্বিনেশনের জিগজ্যাগই ছিল। এখন মাল্টিকালার জিগজ্যাগ প্রিন্টের বেশ চল। হালকা রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডে উজ্জ্বল রঙের জিগজ্যাগও বেশ জনপ্রিয়। শুধু রঙেই নয়, মাপেও আসছে বৈচিত্র্য। আগের একঘেয়ে ধারা থেকে বেরিয়ে ডিজাইনাররা এলোমেলো আকৃতির জিগজ্যাগ নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এখন বড় বড় জিগজ্যাগ নিয়েও কাজ হচ্ছে। রেখা হঠাৎ করেই মোড় পরিবর্তন করতে পারে।
 
 আকার কখনো বড়, আবার কখনো মাঝারি হতে পারে। এই প্রিন্ট একই সঙ্গে আমুদে, আভিজাত্যপূর্ণ, ক্ল্যাসিক আবার মডার্ন। গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীত, যেকোনো ঋতুতে পরার উপযোগী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী ঊর্মিলা মাহজাবিন জানান, ‘দিন কিংবা রাত, শীত কিংবা গরম যেকোনো সময়, যেকোনো অনুষ্ঠানে স্বাচ্ছন্দ্যে পরা যায় বলে ডিজিটাল প্রিন্টের পোশাক আমার প্রথম পছন্দ।’ তবে বুঝেশুনে প্রিন্টের পোশাক পরার পরামর্শ দিলেন টি-এস ক্রিয়েশনের ডিজাইনার তানিয়া তসলিমা। তিনি বলেন, প্রিন্ট নির্বাচনে শারীরিক গড়নটাই মূল বিবেচ্য। ভারী শারীরিক গড়নের ক্ষেত্রে বড় বড় প্রিন্ট এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। এ ধরনের গড়নের জন্য ছোট আকারের প্রিন্টই আদর্শ। আড়াআড়ি প্রিন্টে যেকোনো মানুষকে স্থূল দেখায়, আর লম্বালম্বি তথা ভার্টিক্যাল প্রিন্টের পোশাকে লম্বা ও হালকা মনে হয়। যাঁরা একটু স্লিম, তাঁরা অনায়াসেই বড় বড় প্রিন্টের পোশাক বেছে নিতে পারেন। আর টপ ও বটম উভয় ক্ষেত্রে প্রিন্ট ব্যবহার করতে চাইলে জ্যামিতিক ডিজাইনটিই সবচেয়ে মানানসই।
কখন কোথায় কী

Previous Post
Next Post