মাহে রমজানে সুস্থ থাকার উপায়

এসে গেলো পবিত্র রমজান মাস। রোজার মাসে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সবকিছুতেই আসে বড় পরিবর্তন। তাই এ সময় শরীরের সুস্থ্যতার জন্য কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলতে হবে। কেননা রমজান সিয়ায় সাধনার মাস । এই মাসে যদি সুস্থ না থাকা যায় তবে মনের মত করে ইবাদাত করা যাবেনা । আর ইবাদাত করা না গেলে পুরো রমজানই বৃথা ।

রাসুল সাঃ এরশাদ করেছেন "রমজান মাসের এক দিনের ইবাদত, সারা বছর ইবাদত অপেক্ষা উত্তম ।"
রমজানে সুস্থতা


রমজানের খাদ্যাভাসঃ

পানিঃ
শরীরের অতিরিক্ত পানির চাহিদা পূরণ করতে ইফতারির পর থেকে রাতের খাবার পর্যন্ত পানি,স্যুপ,জুস, ফল, দই, লাচ্ছি, সালাদ এগুলো বারবার খান।

মৌসুমী ফলঃ
দিনভর রোজা রাখার পর ইফতারি শুরু করা যেতে পারে ঘরে তৈরি মৌসুমি ফলের শরবত দিয়ে। সারাদিনের অনাহারের পর ভাজা পোড়া, তেল মসলা শরীরের জন্য একদমই ভালো না, তা খেতে যতই মুখোরোচক হোক না কেন।ইফতারিতে সহজ পাচ্য খাবার শরীরকে ঠান্ডা রাখবে।

ভাজা পোড়াঃ
দই-চিঁড়া, দুধ-কলা-ভাত বা দই-চিঁড়া-ফলের কাস্টার্ড রাখতে পারেন ইফতারিতে।একটু পেঁয়াজু, বেগুনি বা ছোলা না খেলে যদি ইফতারি অসম্পূর্ণ মনে হয়, তবে দই-চিড়া বা ফলাহারের পর সামান্য ভাজাপোড়া খাওয়া যেতে পারে।

কাঁচা ছোলাঃ
অঙ্কুর ওঠা কাঁচা ছোলা ভিটামিন সি এর খুব ভালো উৎস। প্রতিদিনের ইফতার মেনুতে কাঁচা ছোলাটা রাখতে পারেন।

রাতের খাবারঃ
রোজার দিন রাতের খাবারের দিকে বিশেষ নজর দিন। ইফতারিতে বেশি খেয়ে ফেললে স্বাভাবিকভাবেই রাতের খাবার খেতে বেশ রাত হয়ে যায়। আর রাত যত বাড়তে থাকে আমাদের পরিপাক ক্রিয়ার ক্ষমতা ততই কমে আসতে থাকে।এ কারণে রোজার সময়ে রাতের খাবার মেন্যু খুব সাধারণ হওয়া চাই।মাছ, ভাত বা রুটি, সবজি, ডাল এগুলো রাখা যেতে পারে রাতের খাবারে।

সেহরিঃ
সেহরি যেহেতু সারা দিনের রসদ জোগাবে, তাই অবশ্যই সেহরি খেতে হবে।সম্ভব হলে সেহরিতে এক গ্লাস দুধ পান করুন। এতে সারা দিনের প্রোটিনের একটা বড় অংশ পূরণ হবে।
স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য সময়ের তুলনায় পবিত্র রমজানে সাধারণ অসুস্থতার হার তুলনামূলকভাবে কম এবং অনেক ক্ষেত্রে রোজাদার ব্যক্তির উচ্চরক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন, রক্তের কোলেস্টেরল এবং রক্তের গ্লুকোজ খানিকটা কমে। এছাড়াও রোজাদারদের কিছু কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ
কোষ্ঠকাঠিন্যঃ
অতিমাত্রায় ভাজা-পোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার না খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং খাবারে পর্যাপ্ত আঁশ জাতীয় খাদ্য অন্তর্ভুক্ত করে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

মাথাব্যথাঃ
চা,কফি বা তামাক জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া,ঘুমের অভাব বা অতিরিক্ত ক্ষুধা এই মাসে মাথাব্যথার কারণ হতে পারে এবং দিনের শেষ ভাগে এটি বাড়তে পারে।মাথাব্যথার সাথে যদি লো ব্লাড প্রেশার থাকে তাহলে মাথাব্যথা আরোও তীব্র হয় এবং ইফতারের আগে বমি বমি ভাব তৈরি করতে পারে।রমযান শুরুর ১-২ সপ্তাহ আগেই চা,কফি খাবার অভ্যাস কমানো,ক্যাফেইন ছাড়া চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম হলে মাথাব্যথার হাত থেকে বাঁচা যাবে।

ইনডাইজেশনঃ
অতিরিক্ত খাবার পরিহার,পর্যাপ্ত পানি ও ফলের রস পান, অতি মাত্রায় তেলে ভাজা খাবার পরিহার, কার্বোনেটেড পানীয় যেমন; পেপসি , সেভেন আপ পান পরিহার এবং ডিম-ডাল পরিহারের মাধ্যমে অজীর্নতা বা ইনডাইজেশন থেকে বাঁচা যায়।

পেপটিক আলসার ও হার্টবার্ণঃ
যাদের পেপটিক আলসার নেই তাদের ও অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের অজ্ঞতার কারণে এসিডিটি বাড়তে পারে।সৃষ্টি হতে পারে বুক জালা-পোড়া বা হার্ট বার্ণ।পবিত্র রমজানে অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার পরিহার, কফি, চা ও কার্বোনেটেড পানীয় যেমন; পেপসি , সেভেন আপ পান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে ননপেপটিক আলসারের রোজাদারগণ ভালো থাকতে পারেন।

এছাড়া যাদের পেপটিক আলসার আছে তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করে রোজা থাকতে পারেন। আজকাল আধুনিক পেপটিক আলসারের ওষুধ আছে যা একবার সেবনে সারাদিন এসিডিটি মুক্ত থাকা যায়।

কিডনিতে পাথরঃ
এই মাসে প্রচুর পানি পান করতে হবে ইফতারের পর ।পানি কম খাওয়া হলে কিডনিতে পাথর হতে পারে।তাই পানির বিকল্প নেই।

লো ব্লাড প্রেশারঃ
সাধারণত রমজানে অনেকের ক্ষেত্রে রক্তচাপ খানিকটা কমতে পারে। এক্ষেত্রে যাদের লো-ব্লাড প্রেশার আছে তারা আহারের সময় খানিকটা বাড়তি লবণ খেতে পারেন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি ও জুস পান করার মাধ্যমে লো ব্লাডপ্রেশার এর সমস্যা কাটিয়ে রোজা রাখতে পারেন।

জয়েন্ট পেইনঃ
রমজান মাসে অনেক বেশি নামাজ পড়া হয় বলে হাত পায়ের জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে,বৃদ্ধদের জন্য এবং যাদের বাতের ব্যথা আছে তাদের জন্য এই ব্যথা আরো তীব্র হতে পারে।ওজন কমানো এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম এই সময় ব্যথা ভুলে ইবাদাতের পূর্ণতা নিশ্চিত করবে।

হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ
হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা লো ব্লাডসুগার সমস্যা রমজানে একটি অন্যতম স্বাস্থ্য সমস্যা। মজার ব্যাপার হলো যারা নন ডায়াবেটিক তাদেরও হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে।বিশেষ করে সেহেরীর সময় অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত শর্করা জাতীয় খাবার আহার এবং অতি মাত্রায় মিষ্টি জাতীয় খাবার আহারের কারণে শরীরে অতিমাত্রায় ইনসুলিন তৈরি করে।যার ফলে অনেকের রক্তের সুগার কমতে পারে।

তাই সেহেরীর সময় অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার পরিহার করা উচিত। আর ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা উচিত।

*এছাড়াও রমজান মাসে আরো কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে সুস্থ থাকতে পারবেন পুরো মাস জুড়ে। যেমনঃ
রোজা রেখে কোনোভাবেই অধিক শারীরিক পরিশ্রম করা যাবে না।

যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন,তাদেরকে এই সময়ে তা বাদ দিতে হবে। এর পরিবর্তে হালকা যোগ ব্যায়াম করা ভালো।

যথেষ্ট বিশ্রাম নিতে হবে। তাই বলে শুয়ে বসে দিন কাটানো যাবেনা। হালকা চলাফেরা ও ঘরের কাজ নিজ থেকেই করা উচিত। তা না হলে ওজন বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

ইফতারের সময় তাড়াহুড়া করে বেশি খাওয়া যাবে না।

সম্ভব হলে ইফতারের পরে কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটির অভ্যাস গড়ে তোলা।

রোজা রেখে যারা কেনাকাটা করতে যাবেন তাদের বিশেষভাবে নিজের শরীরের প্রতি যত্নবান হওয়া দরকার। একদিনে অনেক ঘুরে কেনাকাটা না করে সম্ভব হলে দু তিন দিনে কেনাকাটা করা ভালো। এতে শরীরের উপর চাপ কম পড়বে।

সুস্থ্য থাকার আরেকটি সহজ উপায় হল হাসি খুশি থাকা। এতে মন ভালো থাকে ফলে শরীরও ভালো থাকে।

সুস্থ্যতার জন্য ধূমপান ও এলকোহল সেবন করা থেকে থেকে বিরত থাকাটা খুব প্রয়োজন। সবাইকে রমজান ও আসন্ন ইদুল ফিতরের শুভেচ্ছা।
Latest
Previous
Next Post »